PREFACE

 

অহনা

অহনা

 

আমার মেয়ে ”অহনা”। বয়স সাড়ে চার। ওর বয়স যখন সাড়ে তিন বছর তখন ওর ব্রেইন টিউমার ধরা পড়ে। আজ সে প্রায় ১ বছর শয্যাশায়ী। ”ভেজিটেটিভ স্টেট”এ তার অনিশ্চিত জীবন কাটছে। প্লে গ্রুপে পড়ুয়া উচ্ছল হাসি খুশি আমার মেয়েটির দুচোখ ভরা স্বপ্ন একটি টিউমারের আঘাতে ১ দিনের মাঝেই চুরমার হয়ে গেল। ইসলাম ধর্মাবলম্বী হবার কারনে এটা আমার ’তকদীর’ বলে মেনে নিয়েছিলাম। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে চিন্তা ভাবনায় ’তদবীরে’ আমি অনেক গলদ খুঁজে পেলাম।

প্রথম যেদিন অসুস্থ হলো সেদিন থেকেই আমি আমার মেয়েকে বিষেশজ্ঞ চিকিৎসকদের দেখাই। ১লা এপ্রিল থেকে ১৪ই আগস্ট ২০১৩, সাড়ে ৪ মাসে চিকিৎসকরা আমার মেয়ের রোগের সাঠিক ডায়াগনসিস করতে পারে নি। তারপর ১৪ই আগস্ট থেকে ১৭ই আগস্ট পর্যন্ত সময়ে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার যে কি ভয়ংকর বেহাল অবস্থা আমরা সেসময়ের প্রতিমুহূর্তে তা অনুধাবন করি। আমার অভিযোগের আঙুল সরাসরি চিকিৎসকদের দিকে উঠে যায়। এরই মাঝে শুভ্র সাদা এপ্রোন পরা ডাক্তারদের গাফিলতিতে বিভিন্ন জায়গায় রোগীদের মৃত্যু, রোগীদের স্বজনদের সাথে মারামারি, নার্সদের পেটানো, সাংবাদিকদের পেটানো এবং সাংবাদিকদের চিকিৎসা সেবা না দেয়ার অঙ্গিকার সবকিছু মিলিয়ে চিকিৎসকদের সম্পর্কে আমাদের মনে এক বিচিত্র অনুভূতি তৈরী হয়। আতঙ্কিত হই এই ভেবে এদের প্রত্যেকেই আমাদের কারও না কারও বাবা, মা, ভাই, বোন, আত্মীয়-স্বজন এবং যখন আমরা এদের পরিচয় দেই, গর্ববোধ করেই দেই।

আমরা যদি একটু চিন্তা করি তাহলে দেখব ৯০% ছাত্র বা ছাত্রী তার স্কুল এবং কলেজ জীবনে ”জীবনের লক্ষ্য” রচনায় মহান পেশা হিসেবে চিকিৎসক হবার স্বপ্ন ব্যক্ত করে। কিন্তু বাস্তবে উপরের সারির অতি অল্প সংখ্যক মেধাবি ছাত্র/ছাত্রীই সত্যিকারভাবে জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছে বা পারে। এই পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেসকল কারনগুলো রচনায় দেখানো হয় তার মধ্যে অন্যতম এই পেশার আকর্ষণীয় মহতী দিকগুলো।

বস্তুতই এই পেশা মহান। অপর জীবনকে রক্ষা করার, উন্নত করা, আর্ত মানুষের পাশে দাড়ানো এর চেয়ে মহান আর কোন পেশা হতে পারে না। এ পেশায় আসতে হলে চাই, মেধা, মনন, জ্ঞানের সুক্ষতা, দক্ষতা এবং অত্যাবশ্যকীয়ভাবে মানবিক বোধ। কোন মানুষ যখন চিকিৎসক হয়ে যায় রোগীর পীড়া সম্বন্ধে তার নিজস্ব কিছু ধারনা জন্মে। তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, কল্পনাশক্তি সাধারন মানুষদের থেকে স্বভাবতই বেশী হয়। যখন কোন মানুষ অসুস্থ হয়ে যায় তখন রোগী নিজে বা তার আত্মীয় স্বজনরা যার যার ধর্ম অনুযায়ী তাদের ঈশ্বরকে ডাকতে থাকেন এবং মর্তে চেয়ে থাকেন চিকিৎসকের দিকে – প্রায়শই তাদের স্থান দেন দ্বিতীয় ঈশ্বরের অবয়বে।

আমার মেয়ের চিকিৎসা ক্ষেত্রে আমি এর ব্যতিক্রম দেখতে পাই। আমার কাছে ঘটনা প্রবাহ এবং কাগজপত্রের প্রমানাদিতে আমি নিশ্চিত হই যে যারা যারা আমার মেয়ের চিকিৎসায় জড়িত ছিলেন তাদের অনেকেই জীবনের লক্ষ্য অর্জনে সার্থক হয়েছেন। হয়েছেন চিকিৎসক, কিন্তু পরিপূর্ণ মানুষ হতে পারেননি। আমি ঠিক করি আমার মেয়ের চিকিৎসার যে গাফিলতিসমূহ হয়েছে তার পূর্ণ বিবরন ওয়েব পেজ খুলে প্রকাশ করব। যে ওয়েব পেজে শুধুমাত্র ভুক্তভোগীরা তাদের অভিজ্ঞতার কথা বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রকাশ করবে।

আমার উদ্দেশ্য জনগন এবং চিকিৎসক উভয়ের মাঝেই সাচেতনতা বাড়ানো যেন আমার মেয়ের মত দূর্ঘটনা আর দ্বিতীয়টি না ঘটে। সেটা আমার শত্রুর জন্যও অনাকাঙ্খিত।

সিদ্ধান্ত নেয়ার পর আমি আমার কয়েকজন শুভাকাঙ্খি এবং স্বজনদের সাথে এ বিষয়ে মত বিনিময় করি। বিভিন্নভাবে বিভিন্ন আঙ্গিকে এর প্রতিক্রিয়া পাই আমি।
যেমন আমার বন্ধু স্থপতি মামনুন মোর্শেদ চৌধুরি বললেন- সহমর্মিতা সহ- আমাদের দেশে কোন সেক্টরেই আমরা বিশেষভাবে এগিয়ে যেতে পারছি না। সবক্ষেত্রেই সততা এবং নিষ্ঠার অভাব। উদাহরন স্বরূপ আমাদের স্থাপত্য চর্চাতেই আমরা এতটা উন্নতি করতে পারছি না বা পেশাগতভাবে সৎ থাকতে পারছি না। সমস্যাটা আমাদের সবার মাঝেই।
আমি দ্বিধান্বীত হলাম।

আমার অরেক বন্ধু স্থপতি মাহমুদ হাসান, সেও প্রায়ই একই কথা বলল। সে আরও যোগ করল, আমাদের দেশে প্রফেশনালদের সার্ভিসের ব্যাপারে কোন দিক নির্দেশনা নেই। যে সকল পেশাজীবীদের সংগঠন গুলো আছে যার যার পেশার ভিত্তিতে, তার বেশিরভাগই রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তিতে ব্যস্ত অথবা বলব সোশ্যাল/ক্লাব একটিভিটিসমূহে ব্যস্ত। সব প্রফেশনালদের যে একটা মূলনীতি মেনে চলা উচিৎ ”জনস্বার্থ রক্ষা বা জনস্বার্থে কোনভাবে আঘাত না হানা” সে বিষয়ে কারই মাথা ব্যাথা নেই। উদাহরনটা পেতে দেরি হলো না – ”দৈনিক কালের কন্ঠ”তে হেডলাইন ”বিএমডিসিতে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ৩০০০ এর বেশি অভিযোগ – তদন্ত হয়েছে মাত্র ২ জনের বিরূদ্ধে”।

কয়েকজন নামকরা আইনজীবিদের সাথে পরামর্শ করতে গেলে তারাও তাদের কর্মক্ষেত্রেও দুরাবস্থার কথা জানালেন। তাঁদের মধ্যে ডঃ কামাল হোসেন, শফিক আহমেদ এসোসিয়েটস এর ব্যারিস্টার মাহবুব শফিক, এডভোকেট কে. এম. হাফিজুল আলম প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে আইনী সহায়তা পাওয়া দুষ্কর হতে পারে বলে মন্তব্য করলেন। উনাদের কথার মাঝেও সামগ্রিক হতাশার ছোঁয়া খুঁজে পাই।

আমার বড় ভাই এবং বন্ধু জাহীদ রেজা নূর “দৈনিক প্রথম আলো”তে আছেন; তার সাথেও পরামর্শ করলাম। তিনিও সহমর্মিতা জানালেন এবং বললেন এই সময় কর্পোরেট দুনিয়ার সাথে রাজনীতি, মিডিয়া, প্রশাসন ইত্যাদি সব ক্ষেত্র একাকার হয়ে গেছে। এই ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে মিডিয়ার অনাগ্রহ থাকতে পারে এবং এই অনাগ্রহ সমাজটাকে ভয়াবহ এক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

এভাবেই আমি বিভিন্ন ক্ষেত্রের যার সাথেই কথা বলি, প্রায়ই সবার মাঝেই একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখতে পাই। সবাই আমরা বুঝছি কিন্তু করছি না বা করার অথবা বলার কোন সুযোগ পাচ্ছি না। এটা শুধু চিকিৎসা ক্ষেত্রেই না অন্যান্য প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

২০১৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে অদ্যাবধি আমার মেয়ের চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে যেমন পেয়েছি চিকিৎসকদের সেবায় অবহলা, গাফিলতি, জ্ঞানের অভাব এবং টাকা পয়সার প্রতি সীমাহীন লোভ; ঠিক তার বিপরীতে পেয়েছি চিকিৎসকদের জীবন বাঁচাবার আপ্রান চেষ্টা, দক্ষতা এবং আন্তরিকতার সাথে রোগী এবং রোগীর অভিভাবকদের সেবা দান করার অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি আরো অনেক সহৃদয় ব্যাক্তিদের পাশে দাঁড়ানো সহ অভাবনীয় সব মানবিক পদক্ষেপসমূহ দেখে আমারও গর্ব নিয়ে ভাবতে ইচ্ছা করে এই ”মানুষ” নামক প্রজাতির সমগোত্রীয় হতে পারার।

এমন নয় যে আমার চারিদিকের দুরাবস্থা আমি আগে দেখিনি। তবে তখন দেখা এবং এখন দেখার মধ্যে অনেক পার্থক্য খুঁজে পেলাম।এভাবে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে বিভিন্ন আঙ্গিকে আমি শুধু ধ্বস এবং ধ্বসই দেখতে শুরু করলাম। সমগ্র মানবতাই যেন ভালোবাসার ক্ষমতাকে হারিয়ে ফেলছে, সেই সাথে শালীনতাবোধ – যা হচ্ছে “নিজের যেটুকু দায়িত্ব সেটাকে সঠিকভাবে এবং নিষ্ঠার সাথে পালন করে যাওয়া” সেটুকুও।

কিছু করার তাগিদ বিভিন্ন বাস্তবতায় কিছুটা পিছিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আমার শয্যাশায়ী মেয়ে, তার দুরাবস্থার ”দৃঢ় প্রতিবাদের মূক প্রকাশ”এর মাধ্যমে আমাকে সচল রাখে।

শেষ পর্যন্ত আমি স্থির করি এই পেইজটা হবে সবার জন্য উন্মুক্ত। সমস্ত ভুক্তভোগী জনতা সমস্ত পেশাজীবিদের অপেশাদার অন্যায় আচরন সম্পর্কে ঘটনাসমূহ লিপিবদ্ধ করতে পারবেন। তবে তা হতে হবে বস্তুনিষ্ঠ ও প্রমান সাপেক্ষ। এটি হবে অভিযোগের একটি “সোশ্যাল ড্রপবক্স”।

আমি শুরু করলাম অহনার ঘটনা দিয়ে – চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে। এগিয়ে নেবার দায়িত্ব – ”বোধ সচেতন” সবার।

এই পেইজটা আমি উৎসর্গ করলাম আমার মেয়ে ”অহনা” এবং ”অহনাদের জন্য।

258 comments

Leave a Reply