অবহেলিত মৃত্যু এবং সরকারি হাসপাতাল

ভাড়াটিয়ার নাম: ছদ্ম
লেখিকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

সিলেটের স্থানীয় এলাকার একটি ফ্ল্যাটে এসি লাগানোর জন্য কয়েকজন মিস্ত্রিকে খবর দেয়া হয়। বিকেল তখন আনুমানিক ৪টা বাজে। ফ্ল্যাটের সেই ভাড়াটিয়া সহ ৩ জন মিস্ত্রি এসির পাইপ সংক্রান্ত সমস্যা দেখার জন্য ছাদে উঠেন। সবাই মিলে ছাদেও এক কোনায় দাড়িয়ে কথা বলছিলেন।

এমন সময় একজন মিস্ত্রি এসির পাইপটি কিভাবে সুবিধামত ফিটিং করা যায় তার জন্য ছাদের কিনারা থেকে নিচে দেখতে চাইলেন। তখন সেখানে উপস্থিত সবাই তাকে এ কাজ করতে সাবধান করেন এবং কিনারার বেশী কাছে যেতে মানা করেন। এভাবে তিনি দেখতে যেয়ে হঠাৎ পা পিছলে ছাদ থেকে একদম নিচে পড়ে যান।

বলা বাহুল্য যে, তিন তলার সেই ছাদে রেলিং না থাকায় এই দূর্ঘটনাটি ঘটে যায়। সাথে সাথেই ভাড়াটিয়া সহ ওই দুজন মিস্ত্রি নিচে নেমে এসে তার কাছে যায়। মিস্ত্রির শরীর রক্তে ভেসে গেছে। সেই অবস্থাতেই ভাড়াটিয়া মিস্ত্রিটিকে কোলে করে একটি রিকশায় উঠিয়ে পার্শবর্তী একটি সরকারী মেডিকেল কলেজে নিয়ে গেলেন। বাড়ির সবাই গেলেন মেডিকেলে।

হাসপাতালে নেওয়ার পর রোগীকে সাথে সাথে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হল। কিছুক্ষণ পর একজন ডাক্তার এলেন। মিস্ত্রির শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষন করে উনি বললেন, রোগীর অবস্থা খুব খারাপ। বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ডাক্তার রোগীকে সেলাইন এবং অক্সিজেন দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে চলে গেলেন। তারপর ২ জন নার্স এসে রোগীকে আইভি সেলাইন দিলেন। কিন্তু মেডিকেলে অক্সিজেন সিলিন্ডারের অভাব থাকায় কোন ভাবেই রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া যাচ্ছিল না। এদিকে রোগীর অবস্থা ভীষণ সঙ্কটাপন্ন। রক্তে শরীর ভেসে যাচ্ছে। রক্ত থামানোর জন্য সেই মুহূর্তে সাকশান মেশিনের দরকার ছিল। কিন্তু সেটিও পুরো হাসপাতাল খুঁজে প্রায় আধ ঘন্টা পর রোগীকে দেয়া হয়। কিন্তু মেশিনটি অনেক পুরনো থাকায় সেটি সঠিকভাবে কাজ করছিল না। সে কারনে রোগীর ক্ষেত্রে বিশেষ কোন লাভ হয় নি।

একজন ডাক্তার ও সেই সময় পাশে ছিলেন না। অনেকক্ষন অপেক্ষার পর একজন ইন্টার্নি ডাক্তার লিখে দিলেন রোগীকে ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে, এ চিকিৎসা এখানে সম্ভব নয়। রোগীর এই গুরুতর অবস্থায় তাকে মেঝের এক কোনায় ফেলে রাখা হয়। নাক, মুখ এবং কান দিয়ে অনবরত রক্ত যাচ্ছে, সেই সাথে ঠিকমত শ্বাস ও নিতে পারছে না। ভাড়াটিয়া এবং তার বাড়ির লোকজন মিলে অনেক খোঁজাখুঁজির পর দেখলেন এক রুমে ৩ জন ইন্টার্নী ডাক্তার বসে টিভি সিরিয়াল দেখছেন। খুব অনুরোধ করে তারা বললেন, রোগীর অবস্থা খুব খারাপ, একটু দেখেন তাকে। তখন সেই ইন্টার্নী ডাক্তার সাথে সাথে বললেন, আমাদের কিছুই করার নেই। আপনারা রোগীকে ঢাকায় নিলে নেন, নাহলে বসে থাকেন।

তখন সাথে সাথে একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ২ জন লোকের সাথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রোগীকে পাঠানো হয়। অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া হয়েছিল ঠিক ৬টা বেজে ৩০ মিনিটে। কিন্তু এই আড়াই ঘন্টা মুমূর্ষু রোগীটি কোন চিকিৎসাই পায়নি। একজন চিকিৎসক ও আসলেন না রোগীকে দেখার জন্য। এমনকি দেখা গেল যে, এত বড় সরকারী হাসপাতালের রোগীদের নিয়ন্ত্রন করছে ঐ মুহূর্তে শুধুমাত্র দুজন ইন্টার্নি ডাক্তার।

রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ উত্তরা পৌছানোর পর মিস্ত্রিটির মৃত্যু হয়।